রানা ইস্কান্দার রহমান:
আমায় ডেকো না আর, আমি রবো তোমাদের মাঝে এই বাংলায়, শৈশবে তুমি কৈশোরে আমি প্রকৃতির সাথে করি মাখামাখি, ভালো বাসার গন্ডির মধ্যে গ্রাম বাংলার হাত ধরি!! বলছিলাম গ্রামবাংলার মেঠো পথে চলা চুড়ি, ফিতার ফেরিওয়ালার কথা। কাঁধে তাঁর কাঁচের বাক্স। বাক্সের ভেতরে-বাইরে চুড়ি, ফিতা, কানের দুল, নূপুর, টিকলি, আলতা, টিপসহ নারীদের হরেক সাজসামগ্রী এর নাম ফেরিওয়ালা। এক সময় গ্রাম বাংলার নারীদের বাজারমূখী যাতায়াত ছিল কম। গ্রামেও ছিলনা তেমন দোকানপাট। তখন গ্রামীণ নারীরা বাড়ির আঙিনায় বসে বিভিন্ন ধর্মীয়, বিবাহ উৎসবসহ অন্যান্য দিনগুলোতে কাঁচের ঢাকনাওয়ালা বাক্সবহনকারী ভ্রাম্যমান ফেরিওয়ালার কাছ থেকে চুড়ি, ফিতা, কানের দুল, নূপুর, টিকলি, আলতা, টিপসহ হরেক সাজসামগ্রী কিনতেন। সৌন্দর্যের পূজারী নারীদের কাছে কসমেটিক্স ফেরিওয়ালার কদর ছিল অন্য রকম। আর এ পেশায় নিয়োজিত থেকে অনেকেই জীবিকা নির্বাহ করতো। কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়া ও প্রত্যন্ত পল্লীর দোরগোড়ায় গড়ে উঠা দোকানপাট আর বর্তমান প্রজন্মের বাজারমূখী নারীদের ভিড়ে চিরায়িত গ্রামবাংলার মেঠো পথের ঐতিহ্যবাহী এ পেশার লোকজন প্রায় হারিয়ে যাচ্ছে।
গত ১৫/২০ বছর আগেও গাইবান্ধার প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে প্রসাধনীর ফেরিওয়ালারা হাতে ও কাঁধে কাঁচের বাক্স নিয়ে গ্রাম, পাড়া, মহল্লায় হেঁটে হেঁটে নানা সুর ছন্দে বলতেন, রাখবেন নাকি গো- চুড়ি, ফিতা, কানের দুল, নূপুর, টিকলি, আলতা, টিপ। এমন হাঁক ডাক শুনে খুকুমণি,তরুনীসহ মায়েরা ভিড় জমাত। সে যেন এক উৎসবের আমেজে পরিণত হত। মায়ের কাছে খুকুমণিরা বায়না ধরতো ফিতা, আলতা, লিপিষ্টিক, নেইল পালিশের। খুকুমণিদের মায়েদেরও দেখতে ইচ্ছে করতো, কি আছে ফেরিওয়ালার বাক্সে? তারা নিজেকে মানিয়ে নেয়ার এটা থেকে ওটা প্রসাধন পরখ করে নিত। খুকুমণিদের কাঁধ ঝুলানো চুলে বেঁধে দেয়া হত লাল টুকটুকে ফিতা। কিন্তু দিন বদলের পালায় এ দৃশ্য এখন তেমন চোখে পড়ে না পাড়া মহল্লায় গড়ে উঠেছে অসংখ্য দোকানপাট।নারীদের সৌখিনতা ও সৌন্দর্যবর্ধনের সব কিছু পাওয়া যাচ্ছে ওই সব দোকানপাটে। এতে নারীরা এখন আর ফেরিওয়ালার কাছ থেকে কসমেটিক্স সামগ্রী কেনেন না। খুকুমণিরাও আজকাল লাল ফিতার বায়না ধরেনা। শহরমূখী আর গ্রামীণ দোকানপাট কেড়ে নিয়েছে ফেরিওয়ালার বিচরণ।
তাই সচরাচর চোখে পড়েনা তাদের। তেমন বেচা-বিক্রি না থাকায় এখন ঝুঁকছেন অন্য পশায়। তবে ধান কাটা মাড়াইয়ের মৌসুমে হঠাৎ করে গ্রামবাংলার মেঠো পথে ২/১ জনের পদচারণা চোখে পড়ে। অনেক দিন পর আজ সোমবার (৬ মে ) সদর উপজেলার লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের উজির ধরণী বাড়ী গ্রামে ফেরি করতে আসা মোন্তাজ আলী’র দেখা। কথা-বার্তার এক পর্যায়ে বলেন, ২৫ বছর ধরে আমি এ পেশায় জড়িত। এক সময় গ্রামের পাড়া মহল্লায় এ ব্যবসার খুবই জৌলুস ছিল। সব চেয়ে লাভের এ ব্যবসায় আয় রোজগারও ভাল ছিল। এখন আর আগের মত গ্রামে কেউ চুড়ি, ফিতা, কানের দুল, নূপুর, টিকলি, আলতা, টিপ কেনেনা। হাতের কাছের মার্কেটে সবরকম কসমেটিক্স সামগ্রীসহ সাজসজ্জার সব জিনিস পাওয়া যায়। এখন সবাই মার্কেটে যান। এতে আগের মত এ ব্যবসা দিয়ে সংসার চলেনা। তবুও ঐতিহ্যের পাশাপাশি সৌখিনতার বসে এ পেশা ধরে আছি।
এ গ্রামের রহিমা বিবি(৬০) ছোট বেলার স্মৃতিচারণ করে বলেন, ছোট বেলায় চুড়ি, ফিতা ওয়ালার কাছ থেকে জিনিস কিনতাম। এখন আর তাদের দেখা যায়না। বাড়ির আশে পাশের বউঝিঁরা মিলে এক সঙ্গে এটা সেটা দেখে মজা করে কিনতাম।আগের দিন গুলো সত্যি অনেক মজার ও অসাধারণ ছিল।
আলোকিত প্রতিদিন /০৬ মে-২০২৪ /মওম
- Advertisement -

